চুল পড়া বন্ধ করার উপায়: কারণ, যত্ন ও কখন ডাক্তার দেখাবেন
চুল পড়া অনেকেরই পরিচিত একটি সমস্যা। গোসলের সময়, চুল আঁচড়ানোর সময় কিংবা বালিশের ওপর চুল পড়ে থাকতে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা হয়। তবে প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। সাধারণত দিনে ৫০–১০০টি চুল ঝরে যেতে পারে। সমস্যা তখনই, যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চুল পড়ে, চুল পাতলা হয়ে যায় অথবা মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় ফাঁকা দেখা দেয়।
চুল পড়া কমাতে শুধু দামি শ্যাম্পু বা তেল ব্যবহার করলেই হয় না। চুলের যত্ন, খাবার, ঘুম এবং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, চুল পড়া বন্ধ করার উপায় এবং কোন অভ্যাসগুলো চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
১. পুষ্টিকর খাবার খান
চুলের সুস্থতার জন্য শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকা জরুরি। বিশেষ করে প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রতিদিনের খাবারে রাখতে পারেন—
- ডিম, মাছ, মুরগির মাংস ও ডাল
- দুধ, দই ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
- পালংশাকসহ বিভিন্ন সবুজ শাকসবজি
- বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার
- মৌসুমি ফল ও তাজা শাকসবজি
শুধু চুল পড়া কমানোর আশায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন না থাকলে অতিরিক্ত কিছু ভিটামিন চুল পড়া বাড়াতেও পারে।
২. চুলে অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার করবেন না
হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার ও কার্লার অতিরিক্ত ব্যবহার করলে চুল দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে বেশি তাপমাত্রায় নিয়মিত এসব যন্ত্র ব্যবহার করলে চুলের ক্ষতি হয়।
চুল শুকানোর সময় সম্ভব হলে প্রাকৃতিক বাতাসে শুকাতে দিন। হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করলে কম তাপমাত্রা বেছে নিন। ভেজা চুল জোরে ঘষে মুছবেন না।
৩. নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন মাথার ত্বক
মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল, ঘাম ও ময়লা জমে থাকলে অস্বস্তি এবং খুশকির সমস্যা হতে পারে। নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
শ্যাম্পু করার সময় নখ দিয়ে মাথার ত্বক আঁচড়াবেন না। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। চুলের ধরন অনুযায়ী সপ্তাহে কয়েকবার শ্যাম্পু করা যেতে পারে।
৪. অতিরিক্ত টান দিয়ে চুল বাঁধবেন না
অনেকেই চুল শক্ত করে বেঁধে রাখেন। নিয়মিত খুব টাইট করে পনিটেইল, খোঁপা বা বেণি করলে চুলের গোড়ায় চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস থাকলে চুলের সামনের অংশ ও কপালের পাশ থেকে চুল কমে যেতে পারে।
তাই চুল ঢিলেঢালাভাবে বাঁধুন। একই জায়গায় বারবার টান পড়ে এমন স্টাইল এড়িয়ে চলুন।
৫. খুশকি ও মাথার ত্বকের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করুন
খুশকি, চুলকানি কিংবা মাথার ত্বকে প্রদাহ থাকলে চুল পড়ার সমস্যা বাড়তে পারে। সাধারণ খুশকির ক্ষেত্রে উপযুক্ত অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু কাজে লাগতে পারে। তবে মাথার ত্বকে অতিরিক্ত চুলকানি, লালচে ভাব, ঘা বা পুঁজ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন
দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, অসুস্থতা, জ্বর কিংবা ঘুমের অনিয়মের পর অনেকের চুল বেশি ঝরতে পারে। একে অনেক সময় টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলা হয়।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম এবং পছন্দের কাজে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৭. চুলে রাসায়নিকের ব্যবহার কমান
বারবার চুলে রং করা, ব্লিচ করা, রিবন্ডিং বা পার্ম করার ফলে চুল দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে। এসব কাজ নিয়মিত না করাই ভালো। করলে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাহায্য নিন এবং চুলের যত্নে সতর্ক থাকুন।
৮. চুলে তেল ব্যবহার করা কি উপকারী?
নারকেল তেল বা অন্যান্য চুলের তেল চুলের শুষ্কতা কমাতে এবং চুলের ভাঙন কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে তেল লাগালেই চুলের গোড়া শক্ত হবে কিংবা সব ধরনের চুল পড়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন প্রমাণ নেই।
তেল ব্যবহার করলে অল্প পরিমাণে লাগান। মাথার ত্বকে চুলকানি বা অ্যালার্জি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, থাইরয়েডের সমস্যা, আয়রনের ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা মাথার ত্বকের রোগ থাকতে পারে। তাই নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—
- হঠাৎ অনেক বেশি চুল পড়তে শুরু করলে
- মাথার কোনো অংশে গোলাকারভাবে চুল উঠে গেলে
- মাথার ত্বকে ব্যথা, চুলকানি, লালচে ভাব বা ঘা হলে
- কয়েক মাস ধরে চুল পড়া চলতে থাকলে
- চুল ক্রমেই পাতলা হয়ে মাথার ত্বক দৃশ্যমান হলে
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা বা মাথার ত্বক পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করলে অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চুল পড়া কমাতে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
চুল পড়া শুরু হলেই অনেকে একসঙ্গে কয়েক ধরনের তেল, শ্যাম্পু ও ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করেন। এতে সমস্যার সমাধান না হয়ে মাথার ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে।
লেবুর রস, পেঁয়াজের রস কিংবা বিভিন্ন মিশ্রণ চুলে লাগালেই নতুন চুল গজাবে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চুল গজানোর ওষুধ ব্যবহার করাও উচিত নয়।
০ টি মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। লেখাটা কেমন লাগল, জানিয়ে দিন।
মন্তব্য করতে লগইন করুন, অ্যাকাউন্ট না থাকলে নতুন একটা খুলে নিন।