শবে বরাতের নামাজের নিয়ম: কত রাকাত, কীভাবে পড়বেন?
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি মুসলিম সমাজে শবে বরাত হিসেবে পরিচিত। আরবি ভাষায় একে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যরজনী। এ রাতকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় চর্চা রয়েছে। অনেকে নফল নামাজ আদায় করেন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চান এবং মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের প্রয়োজন তুলে ধরেন।
তবে শবে বরাতের নামাজ নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই দেখা যায়—এই রাতে কত রাকাত নামাজ পড়তে হয়? এর জন্য কি আলাদা কোনো নিয়ত বা নির্দিষ্ট সূরা রয়েছে? নামাজ আদায়ের বিশেষ কোনো পদ্ধতি কি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে?
এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। কারণ ইবাদতের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ম
শবে বরাত উপলক্ষে নফল নামাজ আদায় করতে চাইলে সাধারণ নফল নামাজের নিয়ম অনুসরণ করেই পড়া যায়। দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করা সুবিধাজনক। এ রাতের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত বা নির্দিষ্ট কোনো সূরা বাধ্যতামূলক—এমন সহিহ হাদিসভিত্তিক বিধান নেই।
নামাজের পদ্ধতি হলো:
প্রথম রাকাত: অজু করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। মনে মনে নফল নামাজের নিয়ত করুন। তাকবিরে তাহরিমা বলে ছানা, আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ুন। এরপর সূরা ফাতিহা এবং পবিত্র কোরআন থেকে অন্য কোনো সূরা বা কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করুন। তারপর নিয়ম অনুযায়ী রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করুন।
দ্বিতীয় রাকাত: দাঁড়িয়ে আবার সূরা ফাতিহা ও অন্য কোনো সূরা পড়ুন। রুকু ও সিজদা শেষে বসে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
এভাবে ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী দুই রাকাত করে একাধিকবার নফল নামাজ পড়া যায়।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত
শবে বরাতের নফল নামাজের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আরবি নিয়ত সহিহ হাদিসে নির্ধারিত নেই। নিয়ত মূলত অন্তরের সংকল্প। তাই মুখে আরবি বাক্য উচ্চারণ না করলেও নামাজ আদায় হবে।
মনে মনে এভাবে সংকল্প করতে পারেন:
বাংলা নিয়ত: আমি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি।
এখানে মনে রাখা দরকার, নিয়তের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্য আবশ্যক নয়। অন্তরের ইচ্ছাই নিয়তের মূল বিষয়।
১০০ রাকাত বা বিশেষ পদ্ধতির নামাজ কি পড়তে হবে?
শবে বরাতের নামাজ নিয়ে প্রচলিত কিছু আমলের মধ্যে ১০০ রাকাত নামাজের কথা শোনা যায়। কোথাও আবার প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সংখ্যকবার সূরা ইখলাস পড়ার নিয়ম প্রচার করা হয়। কিন্তু এ ধরনের নির্দিষ্ট নামাজের পক্ষে নির্ভরযোগ্য হাদিসভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
জর্ডানের সরকারি ইফতা বিভাগের একটি ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, শবে বরাতের রাতে ব্যক্তিগতভাবে নফল ইবাদত করা যেতে পারে; তবে ১০০ রাকাতের মতো নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাজকে শরিয়তনির্ধারিত আমল মনে করার ভিত্তি নেই।
তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ সূরার বাধ্যবাধকতা না রেখে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করাই ভালো।
নামাজের বাইরে যে আমলগুলো করতে পারেন
শুধু নামাজ পড়েই রাতের ইবাদত শেষ করতে হবে, এমন নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য নেক আমলেও সময় দেওয়া যায়।
কোরআন তিলাওয়াত: পবিত্র কোরআন থেকে যতটুকু সম্ভব পড়ুন। শুধু পাঠ নয়, অর্থ বোঝারও চেষ্টা করুন।
তওবা ও ইস্তিগফার: নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। ভবিষ্যতে পাপ থেকে দূরে থাকার সংকল্প করুন।
দরুদ পাঠ: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করুন।
ব্যক্তিগত দোয়া: নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করুন।
মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করা: কারও প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ বা ক্ষোভ থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করুন।
বিশেষ করে শবে বরাতের ফজিলতসংক্রান্ত কিছু বর্ণনায় শিরক ও বিদ্বেষ পোষণকারীর কথা এসেছে। এ কারণে অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পরিষ্কার রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
শবে বরাতের নামাজ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা
শবে বরাতের ফজিলত এবং এ রাতে বিশেষ ইবাদতের বিধান নিয়ে ইসলামি আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একদল আলেম বিভিন্ন বর্ণনা একত্রে বিবেচনা করে এ রাতের ফজিলত স্বীকার করেন এবং ব্যক্তিগত নফল ইবাদতকে উৎসাহিত করেন। অন্যদিকে কিছু আলেম মনে করেন, এ রাতকে বিশেষ নামাজের জন্য নির্ধারণ করার মতো শক্তিশালী প্রমাণ নেই।
তাই এ বিষয়ে মতপার্থক্যকে সম্মান করা প্রয়োজন। কেউ নফল নামাজ পড়লে তাঁকে বাধা দেওয়া কিংবা কেউ বিশেষ আয়োজন না করলে তাঁকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ম নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নফল ইবাদতকে এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না করা, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। দুই রাকাত করে সাধারণ নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা ও দোয়ার মাধ্যমে রাত কাটানো যায়। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজের জীবনকে সংশোধনের সংকল্প করাই হওয়া উচিত ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য।
০ টি মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। লেখাটা কেমন লাগল, জানিয়ে দিন।
মন্তব্য করতে লগইন করুন, অ্যাকাউন্ট না থাকলে নতুন একটা খুলে নিন।